স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে ফাহিমের মন খারাপ হলো। বকলুু মামার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ । তার মানে মামা ঘরে বসে আছে। কিন্তু এ সময় ঘরে দরজা দিয়ে বসে থাকা যে কতটা অস্বাভাবিক ব্যাপার, সেটা শুধু তারাই বুঝবে যারা বকলু মামা কে কম বেশি চেনে। ফাহিম স্কুলের ব্যাগ রেখে পায়ে পায়ে গিয়ে দাঁড়াল বকলু মামার ঘরের সামনে। দরজায় টোকা মারতেই খুলে দিল বকলু মামা, ফাহিম চট করে ঘরে ঢুকে গেল। মামা দরজা বন্ধ করে খাটে এসে বসে পড়ল, মুখটা থমথমে। তার মানে ঘটনা ঘটেছে। ছোট খাটো ঘটনা , বেশ বড় কিছুই হবে। বকলু মামার মন খারাপ করে দিতে পারে এমন মানুষ খুব কমই আছে এই এলাকায় । ফাহিম জানে, মামা একমাত্র বাবাকে ভয় পায় এই বাড়িতে। বাবা নিশ্চয়ই কিছু বলেছে মামাকে। যে মানুষটা পাঁচ মিনিট মুখ বন্ধ করে থাকতে পারে না,সেই মানুষ থমথমে মুখে ঘরে একা বসে আছে, নিশ্চয় বড় কোন ব্যাপার।
এবার বকলু মামার নামের ব্যাপারে একটু বলে নেওয়া যাক। মামার ভালো নাম শফিকুর রহমান কিন্তু এখন মামাকে সবাই বকলু নামেই জানে। এটা মামার উপাধি। সারাক্ষণ এত বকবক করে যে, কথার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে বাবাই মামাকে এই নাম দিয়েছে। সেই থেকে মামা সবখানেই এই নামেই পরিচিত। নতুন নামে কিন্তু একটুও মন খারাপ করেনি মামা, বরং খুশিই হয়েছে। নতুন কারো সাথে পরিচয় হলে মামা নিজেকে বকলু নামেই পরিচয় দেয়,সাথে নামের ইতিহাসটাও বলে দেয় অতি আগ্রহের সাথে। মামার জন্য নামটা যে কত উপযুক্ত, কিছুক্ষণ মামার সাথে থাকলে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। ফাহিম কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল মামার দিকে । সময় নিচ্ছে, যাতে মামা নিজে থেকে কথা বলা শুরু করে। কিন্তু মামা মুখ নিচু করে বসে আছে তো আছেই। আর ধৈর্য রাখতে পারেনা ফাহিম।
নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে , মামা কী হয়েছে তোমার ?
কোন উত্তর নেই। ফাহিম উঠে গিয়ে মামার পাশে বসল। মামার হাত ধরে বলল, মামা প্লিজ কথা বলো, তুমি মন খারাপ করে থাকলে আমার কিছু ভালো লাগে না। আমার কিন্তু এখন ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কথা বলো না হলে এখনই কান্না শুরু করব।
মামা এবার একটু নড়েচড়ে বসল, ওর দিকে তাকাল। ও আবার বলল, প্লিজ মামা বলো তোমার কী হয়েছে? বাবা কিছু বলেছে?
এবার মামা মুখ খুললÑ আচ্ছা তুই বল, বিয়ে বাড়ি গিয়ে একটু বেশি খাওয়া কি অপরাধ?
না, কিছুতেই না। বিয়ে বাড়িতেই তো সবাই যায় মজা করতে। একটু বেশি তো সবাই খায়। ঘটনা কী সব বলো আমার সাথে। মামা যেন একটু উৎসাহিত হলো, মুখের থমথমে ভাব কেটে গেল।
মামা বলল, শোন কাল রাতে আমি গিয়েছিলাম ও পাড়ায় আজমলের বোনের বিয়েতে, ওরা দাওয়াত করেছিল।
ফাহিম বলল, হ্যাঁ জানি তো, কী হয়েছে সেটা বলো।
বিয়ে হলো রাতে। বিয়ে শেষ হতে হতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। ক্ষুধায় আমার পেটে ছূঁচো ডাকছে, মাথা ভোঁ ভোঁ করে ঘুরছে, এমন সময় খাওয়ার ব্যবস্থা হলো। নিয়ম মতো, বরপক্ষের ওরা আগে খাবে, তারপর মেয়ে পক্ষের লোক।
হ্যাঁ সেটাই তো নিয়ম। ফাহিম বলল।
হু , কিন্তু তুই তো জানিস , আমি একটুও ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না। আমি বর পক্ষের সাথে খেতে বসে গেলাম। খাচ্ছি খাচ্ছি, খাওয়া যখন প্র্য়া শেষের দিকে, মুরগি খাসি শেষ করে কেবল গরু শুরু করব, এমন সময় যে লোক গরুও মাংসের দায়িত্বে ছিল, সে ব্যাটা আমার পাশে এসে ফিসফিস করে বলল, ভাইজান এখন আপনি উঠে যান। একটু পরে বসেন, তখন যত ইচ্ছা খাবেন, কোন অসুবিধা নাই। এখন বরযাত্রীদের সামনে এভাবে খেলে আমাদের ইজ্জত থাকবে না। ব্যাস, আমার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। রাত বারোটা পর্যন্ত উপোস রেখে ব্যাটা আমার ইজ্জতের ভয় দেখায়।
তুমি তখন কী করলে? ফাহিম দ্বিগুণ উৎসাহে জিজ্ঞেস করে।
আমার মেজাজ গেল খিচড়ে । ব্যাটাকে তেড়ে মারতে যায় যায় অবস্থা । মাথা ঠাণ্ডা রাখতে পারলাম না। একটু উঁচু গলায় বললামÑ আপনার মাংস দেবার দায়িত্ব মাংস দিবেন। এত কিছু চিন্তা করার দরকার তো আপনার নাই। তুই জানিস তো আমার আবার সবচেয়ে প্রিয় খাবার গরুর মাংস। এককথা-দুকথা বলতে বলতে লোক জমে গেল। এমন সময় আজমলের বাবা এসে হাজির হলো। আমাকে বলল , বাবা তুমি আমার সাথে এসো। ওরা না বুঝে তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলেছে। তুমি এসো আমার সাথে। এ পর্যন্ত বলে বকলু মামা থেমে গেল।
তারপর কী হলো ? ফাহিমের ব্যাকুল প্রশ্ন।
লোকটা ভালো মুখে ডেকে নিয়ে ঠাণ্ডা মাথায় আমাকে অপমান করল। একে তো গরুর মাংস খেতে পারিনি, আমার মাথার নাই ঠিক। আমিও রেগেমেগে দ’ুচারটা কথা শুনিয়ে দিলাম । তারপর হনহন করে বাড়ি এসে শুয়ে পড়লাম। আজ সকালে নাকি আজমলের বাবা বাড়ি এসে নালিশ করেছে তোর বাবার কাছে, আমার নামে। তোর বাবা আমার কোন কথাই শুনল না। সকালে ঘুম থেকে ডেকে তুলে একগাদা কথা শুনিয়ে দিল। সেই থেকে ঘরে বসে আছি। বাইরেই আর যাব না।
(সম্পূর্ণ গল্প মুদ্রণ সংস্করণে)
দীপন জুবায়ের





>
>
>
Amer akta mama celo namta tar keptay,pokate thakto tar matro taka fiftay.golpote sune mamar kotha mone uthay galo.