ড.মুহাম্মদ ইউনূস আমাদের গর্ব,বাঙালির অহংকার। তিনি ১৯৪০ সালে ২৮ জুন চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাজী দুলা মিয়া সওদাগর। মাতার নাম সুফিয়া খাতুন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা। ২০০৬ সালে তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। এ কৃতী পুরুষের ছেলেবেলা কেমন ছিল চলো শুনি তাঁর মুখেই।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : জুলফিকার শাহাদাৎ
নতুনপাতা : আপনার ছেলেবেলা সম্পর্কে জানতে চাই
ড. ইউনূস : ছোটবেলায় আর সবার মতোই ছিলাম-যেভাবে সবাই ছোটবেলায় থাকে। তোমাদের এখন যা যা করতে ইচ্ছে করে, ঠিক আমারও তাই করতে ইচ্ছে করত। এই যে বাইরে টই-টই করে ঘুরে বেড়ানো, খেলতে যাওয়া, গান করা, ছবি আঁকা, অভিনয়- এসবে আমারও ছিল ভীষণ নেশা। নেশা থাকলে কী হবে, আমি স্কুলের পড়া বাদ দিয়ে কখনও এসব করতাম না। আগে পড়ালেখা, তারপর অন্য সব।
নতুনপাতা : মায়ের সাথে ছোটবেলায় আপনার কেমন সম্পর্ক ছিল?
ড. ইউনূস : আমার মা খুব নিয়মতান্ত্রিক মহিলা ছিলেন। নিয়ম ভাংতে দেখলেই রেগে যেতেন। রাগ যেমন করতেন আদরও করতেন তেমন। অসংখ্য গল্প বলতেন আমাদের। এখনও আমার অবাক লাগে আম্মা এত গল্প শিখলেন কোত্থেকে। আম্মার বিয়ে হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে। তাই লেখাপড়া বেশি দিন করতে পারেননি। আমাদের স্বাধীনতা দিতেন। পড়ার বাইরে খেলাধুলা, হই হুল্লোড়, গান-বাজনা, আঁকাআঁকি কিছুতেই তিনি বাধা দিতেন না। মা ছিলেন খুবই ধর্মপরায়ণ।
নতুনপাতা : প্রথম কোন স্কুলে আপনি পড়ালেখা করেছিলেন?
ড. ইউনূস : আমি প্রথম যে স্কুলে পড়ি তার নাম লামারবাজার অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।
নতুনপাতা : আমরা জেনেছি, ছোটবেলায় আপনি আঁকাআঁকি করতেন, অভিনয় করতেন, এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাই।
ড. ইউনূস : ছোটবেলা থেকে আমার বই পড়ার খুব শখ। পড়তে পড়তে কখন যে নিজেই একটা রহস্য উপন্যাস লিখে ফেললাম, অবাক লাগে। আর এ উপন্যাস যখন লিখি তখন আমার বয়স কত জানো? মাত্র ১২ বছর। আমি শহর থেকে মাঝে মাঝে বাবার সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যেতাম। একবার ভাবলাম, গ্রামে একটা নাটক করলে কেমন হয়? তখন গ্রামে যাত্রা, জারিগান, পালাগান, কাউয়ালি- এসবের প্রচলন ছিল খুব। আমিও শহর থেকে গিয়ে গ্রামের বাড়িতে নাটকের মহড়া শুরু করি। মনে আছে, নাটকটি ছিল ‘কারবালার পর’। নাটকের জন্য বাঁশের তলোয়ারের ওপর রাংতার কাগজ লাগিয়ে বানানো তরবারি দিয়ে চলত আমাদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা নাটকের মহড়া। মনে পড়ে, নাটক প্রদর্শনীর দিন ঘটেছিল আরেক কাণ্ড । আমরা বড় দেউড়ি ঘরের এক পাশে পুরুষ ও আরেক পাশে মহিলাদের বসার ব্যবস্থা করে নাটক প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিলাম। নাটকের গান, মিউজিক শুরু হয়ে গেল। এমন সময় আমার দাদা নজু মিয়া সওদাগর একটা বড় লাঠি নিয়ে এসে আমাদের সকল আয়োজন লণ্ডভণ্ড করে দিলেন। বললেন, এসব বেশরিয়তি কাজ। আমরা যে যেদিকে পারলাম পালিয়ে বাঁচলাম। দাদার এমন কাণ্ডে ছোটদের পক্ষ হয়ে আমার মা সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন।
নতুনপাতা : ছোটবেলায় আপনার শখ সম্পর্কে জানতে চাই
ড. ইউনূস : ছোটবেলায় আমি ডাকটিকিট জমাতাম। দেশ-বিদেশের ডাকটিকিট জমানো ছিল আমার শখ। এ ডাকটিকিট আমি গোপাল কাকার দোকানে রাখতাম। সেখান থেকে দু-চারটি ডাকটিকিট বিক্রিও হতো। এতে ক’টি টাকাও পেতাম। বেশ ভালো লাগত।
নতুনপাতা : আমরা জানি আপনি বয়স্কাউট ছিলেন, এ বিষয়ে কিছু জানতে চাই।
ড. ইউনূস : চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। বয়স্কাউটের সুনাম আমাকে ভীষণ আকৃষ্ট করে। আমার প্রিয় শিক্ষক কাজী সিরাজুল হকের নের্তৃত্ব আমাকে মুগ্ধ করে। তাঁর নির্দেশনায় ‘বয়স্কাউটের উপার্জন সপ্তাহে’ আমরা রাস্তায় ফেরি করে, জুতো পালিশ করে, চায়ের দোকানে বেয়ারার কাজ করে উপার্জন করতাম। আমি ১৩ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে বয়স্কাউটের জাতীয় সমাবেশ জাম্বুরিতে যোগদান করার জন্য করাচি গেলাম। করাচির পর পুরো পশ্চিম পাকিস্তান ঘুরে বেড়ালাম। বেড়ানোর শখ তখন থেকেই আমার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে। এরপর ১৫ বছর বয়স কানাডায় বিশ্ব জাম্বুরীতে গেলাম। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র হয়ে জাহাজে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে লন্ডন আসলাম। তারপর কয়েক মাস ধরে নিজেদের গাড়িতে করে সারা ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়া ঘুরে বেড়ালাম। খুব মজা হয়েছিল। পনেরো বছর বয়সে লেখা সে ভ্রমণ কাহিনী ‘বালক পরিব্রাজকের দিনপঞ্জী’ এখন বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে।
নতুনপাতা : আপনার কিছু মজার স্মৃতি?
ড. ইউনূস : প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে আমি এম ই স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম ১৯৫০ সালে। বক্সিরহাটে আমাদের বাসা থেকে এ স্কুলের দূরত্ব অনেক। এম ই স্কুলের অবস্থান হলো চট্টগ্রাম কলেজের পাশে। প্যারেড ময়দানের কাছে। আমার বয়স তখন ১০ বছর। এ সময় চট্টগ্রাম শহরে প্রথম শহর এলাকার বাস চালু হয়। আমার স্কুলে আসা-যাওয়ার গাড়ি ভাড়া দুই আনা। বাবা প্রতিদিন গাড়ি ভাড়ার দুই আনা আমার হাতে দিয়ে আমাকে স্কুলে পাঠাতেন। আমি এক আনা দিয়ে বাসে করে স্কুলে যেতাম। আর এক আনা বাঁচানোর জন্য স্কুল থেকে আসার সময় হেঁটে আসতাম। স্কুলে যাওয়ার পথে ছিল কোহিনূর লাইব্রেরী। বছরের শুরুতে স্কুলের বই কিনতাম এখান থেকে। আর সারাবছর কিনতাম ডিটেকটিভ বই। আসার পথে দাঁড়াতাম কোহিনূর ইলেকট্রিক প্রেসের সামনে- ছাপাখানার দৃশ্য দেখার জন্য। খুব মজা লাগতো। এই ছাপাখানা থেকে সবে নতুন একটা সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হয়েছে। নাম ‘কোহিনূর’। ছাপাখানায় বসতেন সৌম্যমূর্তি নামে এক ব্যক্তি। আমাকে খুব আদর করতেন। বাবাকে চিনতেন। পরে জেনেছি, উনার নাম ইঞ্জিনিয়ার আবদুল খালেক (ষাটের দশকের শুরুতে ‘দৈনিক আজাদী’ পত্রিকা বের করেন)। সদ্য প্রকাশিত ‘কোহিনূর’ পত্রিকার প্রতি আমার আগ্রহ দেখে তিনি একদিন আমাকে বললেন -‘তুমি আমাদের কাগজে লিখবে’? আমি হ্যাঁ বোধক জবাব দিলাম। একদিন উনার কাছে একটা কবিতা জমা দিয়ে এলাম। আর অপেক্ষা করছিলাম, কখন আমার লেখা ছাপা হবে। দেখি আমার কবিতা আর ছাপা হয় না। অধৈর্য হয়ে একদিন জানতে চাইলাম, ‘আমার কবিতা তো ছাপা হলো না’। তিনি অপেক্ষা করতে বললেন। হ্যাঁ, একদিন দেখি আমার কবিতা ছাপা হয়েছে। তখন আমার আনন্দ কে দেখে ?
নতুনপাতা : সাক্ষাৎকার প্রদানের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ স্যার
ড. ইউনূস : তোমাকেও ধন্যবাদ।






>
>
>
Chomotkar ekti shakkhatkar ……valo laglo pore ….onek ojana kotha janlam aaj ei mohan manushti somporke ….thnx a lot Julfikar bhai and of couse you Khalil .
এ লেখাটি পড়ে অনেক কিছু জানলাম। ড. ইউনূস স্যার আমাদের দেশের গর্ব। তাঁর ছেলেবেলা কত সুন্দর। তাঁর সম্বন্ধে আরও যদি লিখা প্রকাশ করা হতো তাহলে অনেক ভালো হতো।
এছাড়া দেশের আরও অনেক বিখ্যাত মানুষ আছেন যাদের ব্যাপারে আমাদের জানা দরকার। এ জাতীয় লেখা প্রতি সংখ্যায় ছাপাবেন আশা করি। আচ্ছা?