‘বিরকিম ইরকিম/ নাগা খিরকিম
বেলট এলট ইলবিল ঝাঁ/ পোলাও কোরমা এসে যা’।
তোমরা হয়ত অনেকেই জানো না, হুমায়ূন আহমেদ তোমাদের জন্য ছড়াও লিখতেন। বাংলাসাহিত্যের কিংবদন্তি তিনি। চল্লিশ বছর ধরে সম্পূর্ণ নিজের ভাষায় দু’হাত ভরে লিখেছেন, আশ্চর্য সব উপন্যাস, তোমাদের জন্যও লিখেছেন, মজার গল্প, রূপকথা, ছড়া। নিজের সম্পর্কে হুমায়ূন নিজেই লিখেছেন, তার জন্ম নেত্রকোনার কুতুবপুরে ১৯৪৮ সালের ১৩ই নভেম্বর মধ্যরাতে। বাবা মুক্তিযোদ্ধা পুলিশ অফিসার ফয়জুর রহমান আহমেদ আর মা আয়েশা ফয়েজের ছয় ছেলেমেয়ের মধ্যে সবার বড় ছিলেন, হুমায়ূন।
লেখালেখির সূচনা সেই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই। নন্দিত নরকে দিয়ে শুরু। এরপর শঙ্খনীল কারাগার, রজনী, এপিটাফ, পাখি আমার একলা পাখি, ফেরা, নিষাদ, দারুচিনি দ্বীপ, নির্বাসন, অমানুষ, রূপালী দ্বীপ, শুভ্র, দূরে কোথাও, মন্দ্রসপ্তক, বাদশাহ নামদার ও নৃপতির মতো পাঠক হৃদয় জয় করা উপন্যাস আসে তার লেখনীতে। প্রতিটি বইমেলায় গত চারদশক ধরেই হুমায়নের বই রয়েছে, কাটতির শীর্ষে। এ যাবত তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩শ ২২টি। এর মধ্যে উপন্যাসই দুই শতাধিক। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন-জোৎস্না ও জননীর গল্প, ১৯৭১, সূর্যের দিনের মতো উপন্যাস। সংলাপ নির্ভর উপন্যাসমালায় মধ্যবিত্তের জীবনের নিস্পন্দ রোমান্টিকতাকে নিখুঁতভাবে তুলে এনেছেন হুমায়ূন। তোমাদের জন্যও লিখেছেন অনেক মজার বই। সেখান থেকে বেশ কয়েকটি বইয়ের খোঁজ দিচ্ছি। পড়ে নিতে পারো-
এংগা, বেংগা, চেংগা
বইটি নিষাদ ও তার মা-বাবাকে নিয়ে। নিষাদের মা প্রায়ই হাসির শব্দ শুনতে পান। খিল খিল হাসি। কিন্তু নিষাদের বাবা শোনেন না। কারা হাসে অমন করে? কারা আবার। ওরা হলো এংগা, বেংগা, চেংগা। এ মজার বইটি প্রকাশ করেছে,অন্যপ্রকাশ।
নুহাশ এবং আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ
নুহাশ নামের নয় বছরের ছোট্ট মেয়ের গল্প নিয়েই এই উপন্যাস। নুহাশের খুব শরীর খারাপ। জ্বর কিছুতেই নামছে না। তার বাবা তাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যায়। ফেরার পথে আইসক্রিম আর বেলুন কিনে দেয়। বাবা তাকে যেমন ভালোবাসে সেও তেমনি বাবাকে খুব ভালবাসে। কিন্তু মা-বাবার মধ্যে কী যেন হয়! এক দৈত্যের সঙ্গে তখন নুহাশের দেখা হয়। সে নুহাশের সব সমস্যার সমাধান করে দেয়। তারা খুব ভালো বন্ধুও হয়ে যায়। বইটি প্রকাশ করেছে আফসার ব্রাদার্স।
বনের রাজা
এক বনে কোনো রাজা নেই। একদিন সেই বনে এলো এক শেয়াল। নিজেই বনের রাজা হয়ে বসল। আর রাজা পাওয়ার পর বনের পশু-পাখিদের কী অবস্থা হয়েছিল? সেটা পাবে বনের রাজা বইতে। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাপ্রকাশ।
নীল হাতী
নীলুকে ওর মামা একটা খেলনা হাতি উপহার দিয়েছেন। সেই হাতি নিয়ে নীলুর কী যে উচ্ছ্বাস। একদিন এক দুষ্ট ছোঁড়া নীলুর নীল হাতিটা নিয়ে যায়। নীল হাতি না পেয়ে নীলুর কী দুঃখ। ওর আর কিছুই ভালো লাগে না। কিন্তু একসময় নীলু ঠিকই খুঁজে পায় ওর প্রিয় নীল হাতিটাকে।
নীল হাতী নামের বানানটি এমন কেন? কারণ তখন হাতি লেখা হতো এভাবে ‘হাতী’। নীল হাতী প্রকাশ করেছে, অন্বেষা।
বোতল ভূত
অদ্ভুত ছেলে মুনির। উদাসী ও গম্ভীর। এক সন্ধ্যায় সে ভূতের বাচ্চা আনতে যায়। যাওয়ার সময় সঙ্গে নেয় গল্পের কথক হুমায়ূনকে। এক বুড়ো ভদ্রলোক হোমিওপ্যাথির শিশিতে ভরে তাদের দেয় একটি বোতলবন্দি ভূত। ফেরার পথে মুনির বোতল ভূত দিয়ে দেয়, হুমায়ূনকে। এরপর ভূতটা হুমায়ূনের জীবনে ঘটায় অদ্ভুত আর মজার সব ঘটনা। কিন্তু উপন্যাসের শেষে বোতলে ভরা ভূতটা যায় কোথায়? বইটি প্রকাশ করেছে প্রতীক প্রকাশনা সংস্থা।
হুমায়ূন আহমেদ ১৯৭২ সালে রসায়ন থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে শুরু করেন অধ্যাপনা। তবে হঠাৎ করেই লেখালেখি ছেড়ে নাটক ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নিমগ্ন হন। বদলে দেন টিভি নাটকে গতানুগতিক ধারা। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা আর সবশেষ ঘেটুপুত্র কমলা বদলে দিয়েছে চলচ্চিত্রের ধারা। হুমায়ূন আহমেদ পেয়েছেন একুশে পদক, বাংলা একাডেমী পুরস্কারসহ দেশে-বিদেশে বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ জুলাই বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১১টা ২০ মিনিটে তিনি অন্তিম নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে ২৩ জুলাই তার মরদেহ দেশে আনা হয় এবং ২৪ জুলাই গাজীপুরের নুহাশপল্লীতে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
শাকিল মাহমুদ





>
>
>