মাহবুব সরকার
বিশ্বকাপ নিয়ে লেখার আগে একদিনের ক্রিকেট সম্পর্কে একটু বলে নেই। ইংল্যান্ডের ঘরোয়া লীগে (যা কাউন্টি লীগ নামে পরিচিত) ১৯৬২ সালে ২ মে সীমিত ওভারের ক্রিকেট শুরু হয়। তার নয় বছর পর এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। প্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। মেলবোর্ন ক্রিকেট মাঠে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যেকার পাঁচদিনের ম্যাচ বৃষ্টির কারণে পরিত্যক্ত হয়। খেলোয়াড়দের অনুশীলন এবং দর্শকদের আনন্দের খোরাক জোগাতে পরীক্ষামূলক ভাবে সীমিত ওভারের ম্যাচ আয়োজন করা হয়। পরে তা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট সংস্থার স্বীকৃতি পায়। স্বল্প সময়ের মধ্যে শেষ, তাছাড়া বানিজ্যিক ভাবেও বেশ লাভবান হওয়ার সুযোগ অছে বলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয় হয় সীমিত ওভারের ক্রিকেট। ১৯৭৫ সালে আট দল নিয়ে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ। ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন। এরপর ১৯৭৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১৯৮৩ সালে ভারত, ১৯৮৭ সালে অস্ট্রেলিয়া, ১৯৯২ সালে পাকিস্তান, ১৯৯৬ সালে শ্রীলংকা, ১৯৯৯ সালে অস্ট্রেলিয়া, ২০০৩ সালে অস্ট্রেলিয়া, ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়া এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে ভারত চ্যাম্পিয়ন হয়।
বিশ্বকাপ-২০১১
১৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় ১৪ দলের অংশগ্রহণে এবারের আসর। ১৯ ফেব্রুয়ারি মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে উউদ্বোধনী ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ ও ভারত। ভারত ৮৭ রানের জয় দিয়ে শুভ সূচনা করে। এরপর কেবল দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে হারতে হয় দলটিকে। তাতে অবশ্য কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে টানা তিন বারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে হারায় মহেন্দ্র সিং ধোনির দল। সেমিফাইনালে চির প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে হারিয়ে ফাইনালে উঠে আসে । শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে শ্রীলংকাকে ৬ উইকেটে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। ১৯৮৩ সালে কপিল দেবের অধিনায়কত্বে শিরোপা জয়ের ২৮ বছর পর এ সাফল্য পেলো ভারত।
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ
এবারের বিশ্বকাপ যৌথ ভাবে আয়োজন করে ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশ। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া দু’টি কোয়ার্টার ফাইনালের আয়োজক ছিল বাংলাদেশ। ভারতের কাছে ৮৭ রানে হার দিয়ে যাত্রা শুরু বাংলাদেশের। কোয়ার্টার ফাইনালের স্বপ্ন নিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করা দলটি ইংল্যান্ডকে হারিয়ে সম্ভাবনা উজ্জ্বল করে। সঙ্গে ছিল আয়ারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে জয়। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে যথাক্রমে ৫৮ ও ৭৮ রানে অলআউট হওয়াই স্বপ্নটা পুরণ হয়নি। তিন ম্যাচে সাকিব আল-হাসানের দল ৬ পয়েন্ট সংগ্রহ করে। ওয়েস্ট ইন্ডিজের পয়েন্ট ছিল সমান। রান রেট ভালো থাকায় তারা বাংলাদেশকে টপকে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে আসে।
উইকেট রহস্যে
উপমহাদেশে বিশ্বকাপ, এখানকার মন্থর উইকেটে স্পিনারদেরই দাপট থাকে। খেলা শুরুর আগে দলগুলো স্পিনারদের কেন্দ্র করেই বোলিং আক্রমণ সাজায়। অস্ট্রেলিয়া ছিলো একমাত্র ব্যতিক্রম। ব্রেটলী, শন টেইট ও মিশেল জনসনের মতো ফার্স্ট বোলাররা ছিলেন দলটির প্রাণশক্তি। খেলা শুরুর পর দেখা গেলো স্পিনারদের পাশাপাশি ফার্স্ট বোলাররাও ভালো নৈপুণ্য প্রদর্শন করছেন। এবারের আসরে দুটি হ্যাট্রিক হয়েছে। দুটিই কিন্তু ফার্স্ট বোলারদের। ওয়েস্ট ইন্ডিজের কেমার রোচ নেদারল্যান্ডসের এবং শ্রীলংকার লাসিথ মালিঙ্গা কেনিয়ার বিপক্ষে হ্যাট্রিক করেন। সেরা বোলিং ফিগারও ফার্স্ট বোলারদের। সেটি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে কেমার রোচের ২৭ রানে ৬ উইকেট। সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রহের দিক থেকে অবশ্য ফার্স্ট বোলার ও স্পিনারদের মাঝে সমতা। পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি ও ভারতের জহির খান ২১ উইকেট করে নিয়ে যৌথ ভাবে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক বোলার।
ব্যাটসম্যানদের দাপট
বোলারদের অনেক বাধ্যবাধকতা থাকে বলে একদিনের ত্রিকেটে এমনিতেই ব্যাটসম্যানদের দাপট। উপমহাদেশের মন্থর উইকেটে দাপট একটু বেশি থাকবে এটাই স্বাভাবিক। সেটি অস্বাভাবিকতা পায়নি। ধারণা মফিক ঠিকই আলো ছড়িয়েছেন ব্যাটসম্যানরা। আসরে চারজন ব্যাটসম্যান চার শতাধিক রান সংগ্রহ করেছেন। শ্রীলংকার তিলকারতেœ দিলশান ৫০০ রান করে সবার ওপরে। তারপরের স্থানে ভারতের শচীন তেন্ডুলকার, তার সংগ্রহ ৪৮২। পরের দুটি স্থানে যথাক্রমে শ্রীলংকা অধিনায়ক কুমারা সাঙ্গাকারা (৪৬৫) ও ইংল্যান্ডের জনাথন ট্রট (৪২২)। দক্ষিণ আফ্রিকার এবি ডি ভিলিয়ার্স, ভারতের শচীন তেন্ডুলকার, শ্রীলংকার তিলকারতেœ দিলশান. একই দলের উপুল থারাঙ্গা এবং নেদারল্যান্ডসের রায়ান দোয়েসকেত দুটি করে শতরানের ইনিংস খেলেন। জনাথন ট্রট সর্বোচ্চ পাঁচটি অর্ধশত রানের ইনিংস খেলেন। নিউজিল্যান্ডের রস টেলর সর্বোচ্চ ১৪টি ছক্কা মারেন। শ্রীলংকার তিলকারতেœ দিলশান সর্বোচ্চ ৫৮টি চার মারেন।
দুই তারকার বিদায় মঞ্চ
ভারতের শচীন তেন্ডুলকার ক্যারিয়ারে ষষ্ঠ এবং শেষ বিশ্বকাপ খেললেন। ২০০৩ সালে ফাইনাল খেললেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১২৫ রানে হেরে যায় ভারত। ফলে শচীনের বিশ্বকাপ গ্রহণও অপূর্ণ থাকে। এবারের আসর শুরুর আগে ভারতীয় দলের সদস্যরা ঘোষণা দিয়েছিলেন -আমরা শচীনের জন্যই শিরোপটা জিততে চাই। ২ এপ্রিল মুম্বাইয়ের ওয়াঙ্খেড় স্টেডিয়ামে শ্রীলংকাকে ৬ উইকেটে হারিয়ে কথাও রেখেছেন সতীর্থরা। তাতে বড় একটি আক্ষেপও দূর হলো। টেস্ট ও একদিনের ম্যাচ মিলিয়ে ৯৯ সেঞ্চুরী করা শচীন ফাইনালেই সংখ্যাটাকে একশ’ করবেন, সমর্থকদের প্রত্যাশা ছিল এমনই। তবে পারেননি তিনি। ১৮ রানেই আউট হয়ে যান রেকর্ডের বরপুত্র। বিশ^কাপে এটিই হয়তো তার শেষ ইনিংস! ৬ বিশ^কাপে শচীন মোট ২ হাজার ২শ’ ৭৮ রান সংগ্রহ করেছেন। এরমধ্যে শতরানের ইনিংস ছিল ৬টি। মোট রান এবং সেঞ্চুরী -দু’টিই বিশ্বকাপ রেকর্ড হয়ে আছে।
শ্রীলংকার বর্ষীয়ান স্পিনার মুত্তিয়া মুরালিধরন শেষ বিশ্বকাপ খেললেন এবার। শচীন এখনও অবসরের ঘোষণা দেননি। তবে বিশ্বকাপের আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছিলেন তামিল এ স্পিনার। ফাইনালে এসেও শিরোপা জয় করতে না পারার হতাশা হয়তো কাজ করছে তার মাঝে। তবে ১৯৯৬ সালের বিশ^কাপ জয়ী দলের সদস্য ছিলেন বলে ক্যারিয়ারটা কিন্তু একেবারে অপূর্ণ নয়। বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার সমৃদ্ধ করেছেন টেস্ট এবং একদিনের ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রহের রেকর্ড দিয়ে। টেস্টে ৮০০ এবং একদিনের ম্যাচে ৫৩৪ উইকেট রয়েছে মুরালিধরনের ঝুলিতে।
যুবরাজের শ্রেষ্ঠেত্ব
একসময় বাজে পারফর্মের কারণে দল থেকে বাদ পড়তে হয়েছিল এ অলরাউন্ডারকে। নানা কথা শুনতে হয়েছে ফিটনেস নিয়ে। বিশ্বকাপ শুরুর পর কিন্তু সে হতাশার লেশমাত্র ছিল না। ভিন্ন এক যুবরাজকে দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ব্যাটিং আর বোলিং, উভয় ক্ষেত্রেই বেশ কার্যকরী ছিলেন পাঞ্জাবের এ তারকা। ভারতের সাফল্যের অন্যতম স্থপতিও তিনি। ৯ ম্যাচে ৩৬২ রান ও ১৫ উইকেট নিয়ে এবারের আসরের সেরা খেলোয়াড় যুবরাজ সিং। আসরটিতে তার ব্যাটিং গড় ছিল ৯০.৫০। জহির খানের পর ভারতীয় বোলারদের মধ্যে তিনিই ভারতীয় সর্বোচ্চ উইকেট সংগ্রাহক।





>
>
>
এটাই ছিল ভারতের সেরা সময়। যার কোন কমতি ছিল না তাই এই জয় লাভ। শুভেচ্ছা রইল ভারত ক্রিকেট টিমের প্রতি…………